শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৬:৫৫
সময়ের ‘আশআসদের’ চিনতে হবে ঐতিহাসিক সংকটের মুহূর্তে

মাদরাসার শিক্ষক ও গবেষক, আমিরুল মুমিনিন হjরত আলী (আ.)-এর যুগের ঘটনাবলিতে আশআস ইবনে কায়েস ও তাঁর পরিবারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে পুনরাবৃত্ত ধরণগুলো চেনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

১. ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সুলাইমানি বলেন, ইতিহাস শুধু পড়ার জন্য নয়; বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সময়কে বোঝার জন্য।

আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর বক্তব্যের আলোকে তিনি বলেন, অতীতের ঘটনাবলি থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ইতিহাসের কিছু ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়। তাই কোনো ঘটনা পড়ার পর সেখানেই থেমে থাকা উচিত নয়। বরং—

  • ঘটনাটির কারণ কী ছিল, তা বুঝতে হবে।
  • বিজয় ও পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে।
  • ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক ধরণগুলো শনাক্ত করতে হবে।
  • অতীতের শিক্ষা বর্তমান যুগে প্রয়োগ করতে হবে।

বক্তার মতে, বর্তমান সময়ের কিছু পরিস্থিতির সঙ্গে হযরত আলী (আ.)-এর শাসনামলে সিফফিনের যুদ্ধের পরিস্থিতির সাদৃশ্য রয়েছে।

২. সিফফিনের যুদ্ধ: যে যুদ্ধ ইমাম আলী (আ.)-এর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল

যুদ্ধের পটভূমি

হযরত আলী (আ.) মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি জারির ইবনে আবদুল্লাহ বাজালিকে মুয়াবিয়ার কাছে পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল, মুয়াবিয়া কেন ইসলামী সরকারের অধীনে থাকা ভূখণ্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, তা জানতে চাওয়া।

কিন্তু মুয়াবিয়া জারিরকে দীর্ঘ সময় শামে আটকে রাখেন। এদিকে তিনি বিভিন্ন শহরে চিঠি পাঠিয়ে সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

যখন হযরত আলী (আ.) দেখলেন, মুয়াবিয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং তাঁর নিজের ভূখণ্ড হুমকির মুখে, তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বক্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধ ছিল হযরত আলী (আ.)-এর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং তিনি নিজের সরকারের প্রতিরক্ষায় অবস্থান নিয়েছিলেন।

৩. মুয়াবিয়ার যুদ্ধ ও শান্তির অবস্থান পরিবর্তন

বক্তা সিফফিনের যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন।

যখন মুয়াবিয়া যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি যুদ্ধের জন্য সৈন্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু যখন দেখলেন তাঁর পরাজয় আসন্ন, তখন হঠাৎ শান্তির কথা বলতে শুরু করেন।

অর্থাৎ, বক্তার বর্ণনায়—

  1. প্রথমে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও শক্তি সংগ্রহ।
  2. পরাজয়ের মুখে শান্তির আহ্বান।
  3. যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরোধ দুর্বল করার চেষ্টা।

তিনি উল্লেখ করেন, কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মুয়াবিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে, দুবার তাঁর বাহন আনতে বলেছিলেন, যাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।

এখান থেকে বক্তা শিক্ষা নিতে বলেন যে, যুদ্ধ ও শান্তির স্লোগানের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা বুঝতে হবে।

৪. আশআস ইবনে কায়েস: তাঁর পরিচয় ও রাজনৈতিক ভূমিকা

ইসলাম গ্রহণ ও পরবর্তী ঘটনা

আশআস ইবনে কায়েস রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ইয়েমেন বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন।

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন কিছু অঞ্চল ইসলাম থেকে ফিরে যায়, তখন আশআসও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত হন।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলে আশআস নিজের গোত্রের লোকদের একটি দুর্গে একত্র করেন। পরে তিনি দুর্গ থেকে বের হয়ে নিরাপত্তা বা আমান প্রার্থনা করেন।

তিনি নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপত্তা চান এবং গোত্রের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন।

বক্তার বর্ণনায়, এ ঘটনা আশআসের রাজনৈতিক চরিত্রের একটি দিক প্রকাশ করে—তিনি পরিস্থিতি বুঝে নিজের স্বার্থ রক্ষায় সমঝোতা করতে পারতেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক

বক্তা আশআসকে বুদ্ধিমান, সময়জ্ঞানসম্পন্ন, বক্তা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি আবু বকরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং পরবর্তী সময়ে ইরাক ও ইরানের কিছু বিজয়াভিযানেও অংশ নেন।

উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে আশআস আজারবাইজানের গভর্নর ছিলেন।

হযরত আলী (আ.) খেলাফতে আসার পর তাঁর ব্যাপারে সম্পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন না। আশঙ্কা ছিল, তিনি সরকারি সম্পদ নিয়ে মুয়াবিয়ার সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।

তাই হযরত আলী (আ.) তাঁকে চিঠি লিখে দায়িত্বের সম্পদ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বোঝান যে, সরকারি দায়িত্ব কোনো ব্যক্তিগত ভোগের বস্তু নয়।

৫. হযরত আলী (আ.)-এর সেনাবাহিনীতে আশআসের অবস্থান

আশআস প্রথমে নিজের গোত্রের সঙ্গে পরামর্শ করেন। গোত্রের লোকেরা তাঁকে বলেন, মুয়াবিয়ার সঙ্গে যোগ দিলে গোত্রের সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে।

শেষ পর্যন্ত আশআস হযরত আলী (আ.)-এর কাছে এসে সম্পদ হস্তান্তর করেন এবং তাঁর সঙ্গে বাইআত করেন।

কিন্তু পরবর্তীতে কুফায় এসে তিনি সেনাপদ নিয়ে অসন্তুষ্ট হন।

হযরত আলী (আ.) হুসান ইবনে মুখদুজকে রাবিয়া ও কিন্দা গোত্রের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। আশআস প্রশ্ন তোলেন—

আমি কিন্দা গোত্রের নেতা হওয়া সত্ত্বেও কেন অন্য গোত্রের একজন সেনাপতি হবেন?

এ নিয়ে কুফায় মতভেদ তৈরি হয়। কেউ আশআসের পক্ষে, কেউ তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

বক্তার বর্ণনা অনুযায়ী, মুয়াবিয়াও এই বিরোধের খবর পান এবং কিছু কবিকে ব্যবহার করে বিভেদ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করেন।

হযরত আলী (আ.) দেখলেন, বিরোধ আরও বাড়লে কুফার পরিস্থিতি দুর্বল হবে। তাই তিনি আশআসকেও সেনা কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।

৬. আশআস ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের তুলনা

বক্তা ইবনে আবিল হাদিদের বক্তব্য উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, আশআসের ভূমিকা হযরত আলী (আ.)-এর সরকারে অনেকটা সেই রকম ছিল, যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ভূমিকা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনার সরকারের সময়ে।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে মদিনার মুনাফিকদের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বক্তার বক্তব্য অনুযায়ী, আশআস শুধু বাইরের কোনো বিরোধী ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি—

  • সরকারের ভেতরে ছিলেন।
  • গুরুত্বপূর্ণ সেনা দায়িত্বে ছিলেন।
  • সমাজে প্রভাবশালী ছিলেন।
  • গোত্রীয় নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন।
  • হযরত আলী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নেতৃত্ব দিতেন।

এখানেই বক্তার মূল সতর্কবার্তা: কোনো ব্যক্তি সরকারের ভেতরে থাকলেই যে সে সবসময় সরকারের স্বার্থ রক্ষা করবে, তা নিশ্চিত নয়।

৭. লাইলাতুল হরীর: সিফফিনের যুদ্ধের সংকটময় রাত

সিফফিনের যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলেছিল। বক্তার বর্ণনায়, যুদ্ধ প্রায় ১১০ দিন স্থায়ী হয় এবং প্রায় ৯০টি সামরিক অভিযান সংঘটিত হয়। কিছু প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এত দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে মুয়াবিয়া তাঁর ভাই উতবা ইবনে আবি সুফিয়ানকে আশআসের কাছে পাঠান।

উতবা আশআসকে বলেন, মুয়াবিয়ার মতে, আলীর সঙ্গে কথা বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আশআসই।

আশআস জানান, আলোচনা হলে তিনি মুয়াবিয়ার পক্ষের লোকদের হযরত আলী (আ.)-এর কাছে নিয়ে যেতে পারেন।

এরপর এক ভয়াবহ রাতের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইতিহাসে ‘লাইলাতুল হরীর’ নামে পরিচিত।

বক্তার মতে, সেই রাতে যুদ্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, মনে হচ্ছিল পাহাড়ের পাথরগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করছে।

৮. আশআসের বক্তৃতা ও যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান

লাইলাতুল হরীরের রাতে আশআস সৈন্যদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন।

তিনি বলেন, মুসলমানরা আগের দিনের যুদ্ধ দেখেছে এবং আরব জাতির ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলে আরব জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং মানুষের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট হবে।

তিনি আরও বলেন, তিনি নিজের মৃত্যুকে ভয় করছেন না; বরং স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত। তিনি মনে করেন, যুদ্ধের মূল্য অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে এবং এখন এটি শেষ হওয়া উচিত।

বক্তার মতে, আশআসের এই বক্তব্যে হযরত আলী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে হযরত আলী (আ.) সৈন্যদের বলেন, শত্রুপক্ষের শক্তি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাই আরও কিছুক্ষণ প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আল্লাহ তাঁদের ও শত্রুদের মধ্যে ফয়সালা করেন।

বক্তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হযরত আলী (আ.) তখন বিজয়ের কাছাকাছি ছিলেন এবং সামান্য আরও প্রতিরোধ করলে শত্রুপক্ষ পরাজিত হতে পারত।

৯. যুদ্ধ ও শান্তি বনাম প্রতিরোধ ও আত্মসমর্পণ

বক্তা সিফফিনের ঘটনাকে একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে তুলনা করেন।

তাঁর মতে, সিফফিনে প্রকৃত দ্বন্দ্ব ছিল—

প্রতিরোধ বনাম আত্মসমর্পণ।

কিন্তু আশআস ও তাঁর মতো লোকেরা এটিকে পরিণত করেছিলেন—

যুদ্ধ বনাম শান্তি।

বক্তার ব্যাখ্যায়, হযরত আলী (আ.) নিজের ইসলামী সরকার রক্ষা করছিলেন। অন্যদিকে মুয়াবিয়া একটি ভূখণ্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে তা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলেন।

তাই বক্তার মতে, এ পরিস্থিতিকে শুধু যুদ্ধ ও শান্তির সাধারণ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে মূল বিষয়টি আড়াল হয়ে যায়।

তিনি বলেন, হযরত আলী (আ.), মালিক আশতার ও হুজর ইবনে আদির মতো ব্যক্তিরা প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কিছু লোক মানুষের যুদ্ধক্লান্তিকে কাজে লাগিয়ে শান্তির দাবি জোরালো করেন।

১০. সালিশের ঘটনা ও মালিক আশতারকে ফিরিয়ে আনা

যুদ্ধের সময় একদল লোক হযরত আলী (আ.)-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করে মালিক আশতারকে ফিরিয়ে আনতে এবং সালিশ মেনে নিতে।

যখন প্রশ্ন ওঠে, কার নেতৃত্বে আলোচনা হবে, হযরত আলী (আ.) মালিক আশতারকে প্রস্তাব করেন।

কিন্তু কিছু লোক বলেন, মালিক আশতার অতিরিক্ত কঠোর এবং বিপ্লবী মনোভাবের অধিকারী। তাই তাঁকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়।

এরপর হযরত আলী (আ.) ইবনে আব্বাসের নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু তাঁকেও গ্রহণ করা হয়নি।

শেষে আবু মুসা আশআরির নাম প্রস্তাব করা হয়। কারণ তিনি প্রথম থেকেই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন।

বক্তার মতে, এভাবে ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যে, হযরত আলী (আ.) ও তাঁর সহযোগীদের যুদ্ধপন্থী এবং অপর পক্ষকে শান্তিপন্থী হিসেবে দেখানো হয়।

ফলে সালিশ সংঘটিত হয় এবং বক্তার বর্ণনা অনুযায়ী, আবু মুসা আশআরি প্রতারিত হন।

১১. আশআসের মাধ্যমে সরকারের ভেতর থেকে দুর্বলতা

বক্তা বলেন, আশআস এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সরকারের ভেতরে থেকেই হযরত আলী (আ.)-এর সরকারকে দুর্বল করেন।

সালিশের পরও আশআস সরকার থেকে বের হয়ে যাননি। তিনি হযরত আলী (আ.)-এর সেনাবাহিনীতে থেকে যান।

যখন হযরত আলী (আ.) আবার মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন, তখন আশআস আবারও সেনাবাহিনীতে উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় কুফায় খারেজিদের হাতে আবদুল্লাহ ইবনে খাবাব ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নিহত হওয়ার সংবাদ আসে।

হযরত আলী (আ.) মনে করেন, প্রথমে কুফার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঠিক করতে হবে; তারপর মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হবে।

১২. আশআসের দ্বিতীয় আঘাত: যুদ্ধের প্রস্তুতি ভেঙে দেওয়া

খারেজিদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ শেষ হওয়ার পর হযরত আলী (আ.) আবার মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেন।

এ সময় আশআস বক্তৃতা করে বলেন, আগে কুফায় গিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে দেখা করা উচিত। কারণ তাঁরা দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে ছিলেন।

হযরত আলী (আ.) এতে সম্মতি দেন এবং সৈন্যরা কুফায় ফিরে যায়।

কিন্তু প্রথম সপ্তাহ, দ্বিতীয় সপ্তাহ, তৃতীয় সপ্তাহ—এভাবে সময় পার হতে থাকে। সৈন্যরা আর যুদ্ধে ফিরে আসে না।

বক্তার মতে, এতে হযরত আলী (আ.)-এর সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে।

মুয়াবিয়া এই সুযোগে হযরত আলী (আ.)-এর নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালাতে শুরু করেন। এমনকি হাজিদের কাফেলাতেও আক্রমণ হয় এবং নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে।

এখানে বক্তা দেখাতে চান, যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কীভাবে একটি সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

১৩. হযরত আলী (আ.)-এর আশআসকে ভর্ৎসনা

একদিন হযরত আলী (আ.) মসজিদে বক্তৃতা করছিলেন। তিনি সালিশ গ্রহণ ও সিফফিনের যুদ্ধ থামানোর বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ সময় আশআস বলেন, তাঁরা ভুল করেননি; বরং সঠিক কাজই করেছেন।

তখন হযরত আলী (আ.) তাঁকে বলেন:

“তুমি কী জানো, কোনটি আমার জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি আমার জন্য ক্ষতিকর?”

বক্তার বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর হযরত আলী (আ.) আশআসের অতীতের কথা উল্লেখ করেন এবং তাঁর ইসলাম-পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থানের সমালোচনা করেন।

তিনি আশআসের আমান প্রার্থনার ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন এবং বলেন, যে ব্যক্তি নিজের গোত্রকে তরবারির সামনে দাঁড় করায়, তার আত্মীয়দের উচিত তার ওপর অসন্তুষ্ট হওয়া।

এই অংশে বক্তা আশআসের রাজনৈতিক চরিত্রের সমালোচনা এবং তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেছেন।

১৪. আশআসরা শুধু অতীতে ছিল না

বক্তার মতে, ইতিহাসের আশআস, মুয়াবিয়া ও শিমরের মতো চরিত্রগুলো শুধু অতীতের মানুষ নয়। তাঁদের মতো রাজনৈতিক আচরণ বিভিন্ন যুগে পুনরাবৃত্ত হতে পারে।

শহীদ মুরতাজা মুতাহহারির বক্তব্যের আলোকে তিনি বলেন, হাজার বছর পর আশআসকে খারাপ বলা সহজ। কিন্তু প্রকৃত বিচক্ষণতা হলো নিজের যুগে আশআসের মতো ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা।

এখানে তিনি সতর্ক করেন—

  • শুধু অতীতের ব্যক্তিকে বিচার করলেই হবে না।
  • বর্তমানের রাজনৈতিক আচরণও বিশ্লেষণ করতে হবে।
  • ব্যক্তির নাম নয়, তার আচরণ ও রাজনৈতিক ভূমিকা দেখতে হবে।
  • কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ঐতিহাসিক চরিত্রের তুলনা করলে সাদৃশ্যের নির্দিষ্ট দিকটি বুঝতে হবে।

বক্তার মতে, বর্তমানের কোনো ব্যক্তি সবদিক থেকে আশআসের মতো না হলেও, কোনো একটি রাজনৈতিক আচরণে তার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকতে পারে।

১৫. বর্তমান সময়ের সঙ্গে সিফফিনের তুলনা

বক্তা সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সিফফিনের তুলনা করেন।

তাঁর মতে, মুয়াবিয়া উসমান (রা.)-এর হত্যার বিষয়কে যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একইভাবে বর্তমান সময়ের কিছু সংঘাতেও কোনো একটি বিষয়কে অজুহাত হিসেবে সামনে আনা হলেও, এর পেছনে আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

বক্তা আমেরিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের তুলনা করে বলেন, সেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি অজুহাত হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল; কিন্তু তাঁর মতে, এর পেছনে আধিপত্যের প্রশ্ন ছিল।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতিরোধের শক্তি দেখে আমেরিকা যুদ্ধবিরতি ও শান্তির কথা বলতে শুরু করে।

এই তুলনা থেকে বক্তার বক্তব্য হলো, কোনো পক্ষ শান্তির কথা বললেই তার প্রকৃত উদ্দেশ্য শান্তি কি না, তা বিশ্লেষণ করতে হবে।

১৬. যুদ্ধ ও শান্তির নামে সামাজিক ক্লান্তিকে কাজে লাগানো

বক্তা বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সমাজে ক্লান্তি, অর্থনৈতিক চাপ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।

মানুষ বাজারে গিয়ে ফল, মাংস বা গাড়ি মেরামতের খরচ বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়। এসব বাস্তব সমস্যার কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

বক্তার আশঙ্কা, কিছু রাজনৈতিক প্রবাহ এ ধরনের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ ও প্রতিরোধের বিষয়ে মানুষের হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে।

তিনি বলেন, এভাবে কেউ বলতে পারে—

  • যুদ্ধ আর কতদিন চলবে?
  • যুদ্ধ করে তো সমস্যার সমাধান হবে না।
  • জনগণের মতামত নেওয়া উচিত।
  • এখন শান্তির সময় এসেছে।

বক্তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য কখনো কখনো প্রতিরোধকে দুর্বল করতে পারে।

তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিশ্বাসঘাতক বলার জন্য প্রমাণ থাকা জরুরি—এ কথাও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৭. আশআসের উত্তরসূরি ও কারবালার ঘটনা

বক্তা আশআসের দুই পুত্রের কথা উল্লেখ করেন—কায়েস ও মুহাম্মদ।

তাঁর বর্ণনায়, উভয়েই কারবালার ঘটনাবলিতে ভূমিকা রাখে।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছে চিঠি

আশআসের এক পুত্র ইমাম হুসাইন (আ.)-কে কুফায় আসার জন্য চিঠি লেখেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, কুফার শাসক নুমান ইবনে বশিরকে সরিয়ে ইমামকে সহযোগিতা করা হবে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হিসেবে বক্তা উল্লেখ করেন, আশূরার দিন সেই একই ব্যক্তি শত্রুপক্ষের একটি অংশের নেতৃত্বে ছিলেন।

ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে তাঁর চিঠির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি চিঠি অস্বীকার করেন। তখন ইমাম বলেন, সে মিথ্যা বলছে এবং চিঠিটি তারই লেখা।

মুসলিম ইবনে আকিলের ঘটনা

আশআসের অন্য পুত্র মুসলিম ইবনে আকিলের গ্রেপ্তারের ঘটনাতেও যুক্ত ছিলেন বলে বক্তা উল্লেখ করেন।

মুসলিম ইবনে আকিল যখন কুফায় সমর্থকদের নিয়ে ইবনে জিয়াদের প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যান, তখন আশআসের পুত্রের হাতে একটি পতাকা দেওয়া হয়।

ঘোষণা করা হয়, যে ব্যক্তি এই পতাকার নিচে আসবে, সে নিরাপদ থাকবে।

এর ফলে মুসলিম ইবনে আকিলের কিছু সমর্থক তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মুসলিম একা হয়ে পড়েন এবং গ্রেপ্তার হন।

বক্তা এই ঘটনাগুলোকে আশআসের রাজনৈতিক আচরণের পরবর্তী প্রজন্মে পুনরাবৃত্তির উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

১৮. ইতিহাসে একই ধরনের চরিত্রের পুনরাবৃত্তি

শহীদ মুতাহহারির বক্তব্যের আলোকে বক্তা বলেন, আশআস, মুয়াবিয়া ও শিমরের মতো ব্যক্তিরা ইতিহাসে একক বা বিচ্ছিন্ন চরিত্র নন।

বিভিন্ন যুগে একই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা আবির্ভূত হতে পারেন।

এ ধরনের ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য হিসেবে বক্তা উল্লেখ করেন—

  1. ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা।
  2. সমাজে প্রভাবশালী হওয়া।
  3. রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝে অবস্থান পরিবর্তন করা।
  4. মানুষের ক্লান্তি ও অসন্তোষকে কাজে লাগানো।
  5. সংকটময় মুহূর্তে প্রতিরোধ দুর্বল করা।
  6. নিজের স্বার্থে সমঝোতা করা।

বক্তার মতে, ইতিহাসের শিক্ষা হলো, এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের যুগে চিনতে শেখা।

১৯. ক্ষমতার ভেতরে থেকেও ক্ষতি করা সম্ভব

বক্তা আশআসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি সরকারের ভেতরে থাকলেই সে সরকারের জন্য নিরাপদ—এমন নয়।

আশআস হযরত আলী (আ.)-এর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু বক্তার বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা সরকারের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, ইতিহাসে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন, যারা বাহ্যিকভাবে সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু পরে তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

তবে বক্তা স্বীকার করেন, কোনো ব্যক্তিকে বিশ্বাসঘাতক বা শত্রুর সহযোগী বলার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ করা উচিত নয়।

এখানে মূল শিক্ষা হলো, ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থান নয়; বরং তার আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং ফলাফলও বিবেচনা করতে হবে।

২০. সমাজের অসন্তোষ ও সম্ভাব্য অস্থিরতা

বক্তব্যের শেষ অংশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

বক্তার মতে, যখন কোনো সমাজ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক সমস্যার মধ্যে থাকে, তখন মানুষের মধ্যে ক্লান্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।

যদি কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রবাহ এই অসন্তোষকে ব্যবহার করে, তাহলে তা বড় ধরনের সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যুদ্ধের সময়ে ‘যুদ্ধ ও শান্তি’র দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে প্রতিরোধ দুর্বল করা হতে পারে।

তাঁর মতে, ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে এমন পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

২১. মূল শিক্ষা ও উপসংহার

এই বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো—ইতিহাসের রাজনৈতিক চরিত্র ও ঘটনাগুলো থেকে বর্তমান সময়ের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা।

বক্তা আশআস ইবনে কায়েসের ঘটনাকে ব্যবহার করে দেখাতে চান, একজন ব্যক্তি কীভাবে—

  • ক্ষমতার ভেতরে অবস্থান করতে পারে;
  • জনগণের মধ্যে প্রভাব রাখতে পারে;
  • গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারে;
  • সংকটের সময়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে;
  • যুদ্ধক্লান্তি ও সামাজিক অসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারে;
  • প্রতিরোধের শক্তি দুর্বল করতে পারে।

বক্তার মতে, হযরত আলী (আ.)-এর যুগের সিফফিনের ঘটনাবলি শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; বরং রাজনৈতিক আচরণের কিছু পুনরাবৃত্ত ধরণ বুঝতে সাহায্য করে।

তাই তাঁর আহ্বান হলো, ইতিহাস পড়তে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে এবং নিজের যুগে সেই শিক্ষা প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে সংকটের মুহূর্তে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচরণ, উদ্দেশ্য ও সিদ্ধান্তের ফলাফল সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

সারকথা: অতীতের আশআসকে চিনে রাখা যথেষ্ট নয়; বরং নিজের সময়ের অনুরূপ রাজনৈতিক আচরণ ও চরিত্রকে চিনতে পারাই ইতিহাস থেকে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha